,

সর্বশেষ
bnr ad 250x70 1

সৌদির রাজকীয় ‘গেমস অব থবস’! ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বিডিনিউজ রিভিউজ.কম::সৌদি কিংডমের জন্য গত শনিবারের দিনটি কী ‘রেড ওয়েডিং’ এর একটি মুহূর্ত ছিল? রিয়াদের সঙ্কট আরো ঘনীভূত হওয়ায় এখানে সৌদির অনর্থক আগড়ম-বাগড়মের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরা হলো।

এই সঙ্কটের শুরু হয়েছিল লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির পদত্যাগের মাধ্যমে। এটি ছিল রিয়াদে হারিরির পে-মাস্টারদের একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ।

সৌদি মালিকানাধীন একটি টিভি চ্যানেলে সৌদি রাজধানী রিয়াদ থেকে হারারি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈদেশিক হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তিনি অতীত হয়ে গেছেন।

ওই সময় তিনি জানিয়েছিলেন যে তার প্রয়াত বাবার মতো তার ওপরও হত্যার হুমকি ছিল।

শনিবারের দিনটি সন্ধ্যায় পরিণত হওয়ার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুব কাছেই বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। পরে জানা যায় যে, এটি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

এটি ইয়েমেনের যুদ্ধের উপর একটি বিস্ময়সূচক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সৌদি আরব কর্তৃক ইয়েমেনে ‘ডিসিশিভ স্ট্রম’ অপারেশন শুরু করার দুই বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এই যুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে।

একই দিন ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতে পৌঁছলে আরো একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে এবার আর হুতিরা নয়, স্বয়ং সৌদিই এই বিস্ফোরণ ঘটায়। একটি রাজকীয় আদেশে কয়েকজন প্রিন্স, ধনকুবের ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে আটক করা হয়।

পাশাপাশি কয়েকজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাকেও বরখাস্ত করা হয়। আটকদের মধ্যে প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর কয়েকজন পুত্রও রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান ছিলেন।

এই তিনটি ঘটনারই ভূকম্পীয় পরিণতি কেবল সৌদি আরবের জন্য নয়, তা এই অঞ্চল ছাড়িয়ে আরো বহুদূর বিস্তৃত হতে পারে।

হারিরির পদত্যাগ বা তার সৌদি স্পনসর কর্তৃক বরখাস্তের ঘটনা যে কোনো সরকারের জন্য সর্তক ঘন্টাধ্বনি। কেননা এই অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হোক তা কেউ দেখতে চায় না।

বিভিন্ন ধরনের আগড়ম-বাগড়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ইসরাইল। ইসরাইল গত কয়েক মাস ধরে তার উত্তর ফ্রন্টে সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে-তা এখন আর কোনো গোপন বিষয়।

অন্যদিকে, দামেস্কের আসাদ সরকারকে সাহায্য করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। তেল আবিব তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন করছে। আজ হোক-কাল হোক দেশটি বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিতে এটি পরীক্ষা করতে চাইবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

হারিরিকে পদত্যাগে বাধ্য করার ফল খুব একটা সুখকর হবে না। ইরানের প্রক্সি হিসেবে তার এই পদচ্যুতি লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যে কোনো ধরনের আগ্রাসনকে সহায়তা করবে।

অন্যদিকে, হামাস কর্তৃক গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করার পর থেকে গাজা রাজনৈতিকভাবে এখন নিরপেক্ষ অবস্থায় রয়েছে। আক্রমণ করার জন্য ইসরাইল এটিকে তাদের সর্বোত্তম সময় হিসেবে দেখতে পারে। এই ধরনের আক্রমণ পশ্চিমাদের জন্য নতুন সৌদি নেতৃত্বের ‘মধ্যপন্থার’ বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য একটি নিখুঁত সুযোগ প্রদান করবে। এটি ইসরাইলকে কি উৎফুল্ল করবে না?

ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরবের শত শত কোটি ডলার খরচ হয়েছে। ইয়েমেনের বৈধ সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে এবং ইরানকে দমনের উদ্দেশ্যে এই যুদ্ধ শুরু করেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদির উভয় লক্ষ্যই ব্যর্থ হয়েছে।

তবে, অন্য একদিক দিয়ে এটি সফল হয়েছে আর তা হলো এই যুদ্ধ হাজার হাজার নির্দোষ মানুষকে হত্যা করেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিপীড়িতদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তেহরানের অবস্থানকে সহায়তা করেছে।

ইয়েমেনে চলমান অভিযানে রিয়াদের টার্গেটসমূহ তরুণ প্রিন্সকে আরো বেশি বেপরোয়া ও ধ্বংসাত্মকের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সৌদির এই গণগ্রেপ্তার ও বরখাস্তের পিছনে কি উদ্দেশ্য রয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান এবং সিংহাসনের এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপসারণের অর্থ হচ্ছে- বিন সালমানের ক্ষমতা দৃঢ় করার একটি সুস্পষ্ট খেলা।

যাইহোক, যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর তা হল ধনকুবের প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালালকে আটকের ঘটনা।

কাগজ-কলমে বিন তালাল এবং বিন সালমান উভয়েই স্বর্গ নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর। তারা উভয়েই সৌদি আরবকে একটি ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান, উভয়েই গণতন্ত্র এবং উদারনীতির ধারণাকে ঘৃণা করেন এবং উভয়েই রাজ্যের সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে সমানভাবে ইচ্ছুক।

বিন তালালের ঘনিষ্ট একজন জানিয়েছেন যে, তাকে আটকের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে সৌদি আরবের অস্থিতিশীল অর্থনীতিকে সাহায্য করার জন্য তালালের অর্থ জমা দিতে তার অস্বীকৃতি। এটি হচ্ছে দেশটির ধনী অভিজাতদের জন্য সালমানের একটি বার্তা আর তা হলো-টাকা প্রদান কর, নয়ত জেলে যাও।

‘থবস গেমসের’ সৌদি সংস্করণের মাধ্যমে ৩২ বছর বয়সী বিন সালমান দেখাতে চান যে রাজকীয় গাউন পরার জন্য তিনি সমগ্র অঞ্চলকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে ইচ্ছুক। তার কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যেই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদকে (জিএসসি) ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি।

ইয়েমেনকে এখন আর একটি কার্যকরী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা যায় না। মিশর হচ্ছে টিকটিক করা একটি টাইম বোম্ব এবং এখন লেবাননেও যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ নিয়ে চিন্তা করার অনেক কিছুই রয়েছে।

– আলজাজিরার প্রতিবেদন।

মতামত...